মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসনের উল্লেখযোগ্য বিশেষ দিক সমুহ
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ | English Version
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ | English Version
মালয়েশিয়া বাংলাদেশিদের জন্য অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। ২০১২ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণ শুরু হলেও অগ্রগতির অভাবে ২০১৬ সালে "G2G Plus" চুক্তির আওতায় সীমিত সংখ্যক এজেন্সি দিয়ে কর্মী পাঠানো হয়। ২০১৮ সালে কিছু সমস্যার কারণে প্রক্রিয়া বন্ধ হলেও ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া পুনরায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ২০২১ সালে ২৫টি এজেন্সি এবং পরবর্তীতে ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া পুনরায় চালু হয়, যা ২০২২ সালের আগস্টে শুরু হয়। এ পর্যন্ত ৩.৫৯ লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন, যদিও উচ্চ অভিবাসন ব্যয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অতিরিক্ত মধ্যসত্ত্বভোগীর কারণে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে শুধুমাত্র অনুমোদিত এজেন্সি দিয়ে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব। এছাড়া নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শর্তাবলী সম্পর্কে কর্মীদের ধারণা দেওয়া, এবং বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৈধ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।
সৌদি আরবের পর বাংলাদেশীদের জন্য ২য় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় ২০০৮ সাল হতে বন্ধ থাকার পর সরকারী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া G2G চুক্তি স্বাক্ষর করে।
সরকারী ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতিক্রমে ২০১৬ সালে “G2G Plus” চুক্তি স্বাক্ষরের পর উহার আওতায় সীমিত সংখ্যক ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে ২০১৭-১৮ সালে ২.৭৮ লাখ কর্মী গমন করে।
মালয়েশিয়া সরকারের এই উদ্যোগটি দেশীয় কিছু এজেন্সি ও প্রতিবেশী দেশের বিরোধের মুখে ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি বিস্তারিত তদন্ত শেষে মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানব সম্পদ মন্ত্রী এম.কুলাসেগারান ২০১৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার জাতীয় সংসদে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে রিপোর্ট উত্থাপন করেন এবং পুনরায় বাংলাদেশ হতে কর্মী নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অত:পর ২০২১ সালে ১৯ শে ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্বারকের আওতায় সীমিত সংখ্যক ২৫ (পঁচিশ)টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ শুরু হয়। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার সরকার BOESL সহ ১০১ টি এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের অনুমোদন দেয়। তালিকাভুক্ত এই ১০১টি এজেন্সির সাথে সহযোগী এজেন্সি হিসেবে অনেক এজেন্সি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতিক্রমে সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে এই ধাপে কর্মী প্রেরন শুরু হয় ২০২২ সালের আগস্ট মাসে এবং এ পর্যন্ত ৩ লক্ষ ৫৯ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় গমন করেছে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ার অনুমোদন প্রাপ্ত ১০১ টি এজেন্সির সাথে Supply Chain এর আওতাভূক্ত হয়ে আরো ৫/৬ শত এজেন্সি এই খাতে কাজ করছে। মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদন প্রাপ্ত ও তালিকাভূক্ত এই এজেন্সি সমূহের অনুকূলে Allocation হওয়ায় পূর্বেই মধ্যসত্ত্বভোগীরা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের সাথে ভিসা ক্রয় বিক্রয়ে সম্পৃক্ত হয় বিধায় অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধুমাত্র অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরনের ব্যবস্থা করতে পারলে অভিবাসন ব্যয় ৫০% কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এতে সরকারের পূর্ণ সমর্থন প্রয়োজন। কেননা এতে সংশ্লিষ্ট সহযোগী এজেন্সি ও ভিসা ব্যবসায়ে লিপ্ত ব্যক্তিগন ক্ষুদ্ধ হয়ে বিরোধিতা করতে পারে।
মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে সেদেশে নিয়োজিত পুরাতন কর্মীগন ভিসা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে সরাসরি নিয়োগকর্তাদের সাথে ভিসা ক্রয়ের ব্যবসায়িক লেনদেন করে থাকে। একই সাথে মধ্যসত্ত্বভোগী ও ভিসা সংগ্রহকারীগন Supply Chain নিয়ন্ত্রন করে বিধায় ভিসার উচ্চমূল্যের কারনে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায়।
সরকার বা রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহের পক্ষে অভিবাসন ব্যয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। কেননা মধ্যসত্বভোগী ভিসা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় নিয়ামক (Factor) হিসাবে কাজ করে।
বেতন তুলনামূলক ভাবে বেশী হওয়ায় (ন্যূনতম ১৫০০ রিঙ্গিত) মালয়েশিয়ার অভিবাসনের নিমিত্তে ব্যয়িত অর্থ কর্মীগন ৫/৬ মাসের মধ্যে তুলতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে অন্ততঃ ৫ হতে ১০বছর পর্যন্ত প্রবাসে অবস্থান করে তাদের অর্জিত অর্থ দেশে প্রেরণে সক্ষম হন।
এই প্রক্রিয়াটি বিদেশে জনশক্তি প্রেরণের শুরু হতে চলমান আছে এবং ইহা একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। একটি গ্রুপ ধার-দেনা করে বিদেশে গিয়ে Settle হওয়ার পর কয়েক বছর কাজ করে স্বাবলম্বী হয়ে দেশে ফিরে আসে এবং পরবর্তীতে একইভাবে অন্য একটি গ্রুপ তাদের স্থানে গমন করে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী গমনের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দিক দিয়ে মালয়েশিয়া ৮ম স্থান হতে বর্তমানে ৬ষ্ঠ স্থানে উন্নীত হয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক ইত:মধ্যে বরাদ্দকৃত কোটা (৪ লাখ ৮৭ হাজার)-এর অতিরিক্ত হিসেবে আগামী বছরের শুরুতে আরো সমসংখ্যক কোটা বরাদ্দ দিবে বলে অনেকটা নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এর ফলে বর্তমান সমঝোতা স্মারক ও প্রক্রিয়ার আওতায় সর্বমোট ৮-৯ লক্ষ কর্মীর সেদেশে কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা যায়।
অভিবাসন ব্যয় ছাড়াও নিরাপদ অভিবাসন, কর্ম পরিবেশ এবং বেতনভাতাসহ কর্মীদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অতীব জরুরী এবং চাকুরীর শর্তাবলী সম্পর্কে কর্মীদের সম্যক ধারনা দেয়া প্রয়োজন।
সকল Stake Holder দের Automation এর আওতায় এনে বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে পারলে এই সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং কর্মীগণ এর সুফল ভোগ করতে পারবে।
বৈধ পথে কর্মী গমন বাধাপ্রাপ্ত হলে অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৪-১৫ সালে মালয়েশিয়ায় বৈধ অভিবাসন বন্ধ থাকায় অবৈধ পথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া গমনকালে বহু কর্মী প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বর্ডারে মৃত্যুবরণ করেন।
ইত:মধ্যে গমনকারী ৩ লাখ ৫৯ হাজার কর্মীর মধ্যে যে কিছু সংখ্যক কর্মী কাজ পাচ্ছেন না তার মূল কারণ মালয়েশিয়া সরকার সকল আবেদনপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই না করে কোম্পানির অনুকূলে কর্মী নিয়োগের অনুমতি দেওয়ায় এরূপ হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় এ সকল কর্মীকে অন্য কোম্পানিতে কর্মসংস্থানের জন্য একটি পুল গঠন করেছে।
ট্যুরিষ্ট ভিসায় গমন করে সেদেশে অবৈধভাবে কাজ করার পর কোন সমস্যা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে একদিকে যেমন তারা কোন আইনগত সহায়তা পায় না তেমনিভাবে বৈধ কর্মী ভিসায় গমনকারীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
উপরিউক্ত সমস্যা হতে উত্তোরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে Joint Working Group (JWG) মিটিং-এ এই বিষয় সমূহ নিয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে ইহার প্রতিকার ও সমাধান করা সম্ভব।