মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। ২০০৮ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে। পরে ২০১২ সালে G2G চুক্তির আওতায় কর্মী নিয়োগ শুরু হলেও চার বছরে মাত্র আট হাজার কর্মী যেতে পেরেছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে G2G প্লাস চুক্তির আওতায় বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ২.৭৮ লক্ষ কর্মী পাঠানো হয়। ২০২১ সালে নতুন সমঝোতার মাধ্যমে পুনরায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার ফলে প্রায় ৪.৭ লক্ষ কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশী কর্মীদের বেতন তুলনামূলকভাবে ভালো এবং এটি দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়া সরকারও নির্দিষ্ট সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের সিস্টেম চালু করেছে। এই বাজারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দুই দেশের সরকার কাজ করছে।
বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের জন্য সৌদি আরবের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া। তবে সে দেশের সরকার ২০০৮ সাল হতে আমাদের দেশ হতে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখে। অতঃপর দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে দু’দেশের সরকারের মধ্যে ২০১২ সালে একটি সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত স্মারকের আওতায় শুধুমাত্র সরকারী ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয় যা’ G2G কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০ হাজার কর্মী পাঠানোর জন্য মালয়েশিয়া সরকার চাহিদাপত্র প্রদান করে। এজন্য সরকার প্রায় ১৪ লক্ষ কর্মী বিএমইটিতে রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ায় বিমান টিকেট ও আনুসঙ্গিক ব্যয় নিয়োগকারীর বহন করার কথা ছিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাগন বাংলাদেশ হতে কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে ২০১২ সালের পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ০৪ (চার) বছরে মাত্র ০৮ (আট) হাজারের মত কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে সক্ষম হন।
তবে এই সময়ের মধ্যে বৈধ পথে কর্মী গমন উল্লেখযোগ্য না হওয়ার কারণে অবৈধ পথে থাইল্যান্ড হয়ে কর্মীগন মালয়েশিয়া যেতে চেষ্টা করেন এবং অনেক কর্মী পথিমধ্যে বিভিন্ন কারণে হয়রানি ও অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশাসহ অনেকেই মৃত্যুবরন করেন। সরকারী ব্যবস্থাপনায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার বেসরকারী নিয়োগকর্তাদের অনাগ্রহ এবং উভয় দেশের বেসরকারী এজেন্সি সমুহের সম্পৃক্ততা না থাকায় G2G পদ্ধতিটি সফল হয়নি।
এই প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় মধ্যে নতুন করে স্বাক্ষরিত জি টু জি প্লাস চুক্তির আওতায় ২০১৭-১৮ সালে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সীর মাধ্যমে প্রায় ২.৭৮ লক্ষ কর্মী মালয়েশিয়ায় গমণ করেন। চাকুরির বেতন-ভাতা ও কর্ম পরিবেশ সন্তোষজনক হওয়ায় এই কর্মসূচীর আওতায় গমনকারী বাংলাদেশী কর্মীদের কাছ থেকে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কিছু সংখ্যক এজেন্সি এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের প্রতিযোগীদের ভুল তথ্যের কারণে মালয়েশিয়া সরকার এই কর্মসূচীটিকে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে স্থগিত করে।
পরবর্তীতে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিস্তারিত তদন্ত শেষে মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানব সম্পদ মন্ত্রী এম. কুলাসেগারান ২০১৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর মালযেশিয়ার জাতীয় সংসদে অভিযোগের সত্যতা পাওযা যায়নি মর্মে রিপোর্ট উত্থাপন করেন এবং পুনরায় বাংলাদেশ হতে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দু-দেশের সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ এবং বায়রা’র নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায় ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর পুনরায় নতুন করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়া সরকার নির্দিষ্ট সংখ্যক BRA (Bangladesh Recruiting Agencies) এর মাধ্যমে বাংলাদেশ হতে কর্মী নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রথামিকভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের কাজটি সকল এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করে। সে মোতাবেক মন্ত্রণালয় হালনাগাদ নবায়নকৃত সকল রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। তবে বৈদেশিক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অসুস্থ্ প্রতিযোগিতা রোধ করা, ভিসা ক্রয়-বিক্রয় বন্ধের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং এজেন্সি সমূহের দায়-বদ্ধতা নির্ধারণে সহজ হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার সীমিত সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমেই বাংলাদেশী কর্মী নেওয়ার নীতিতে অনড় থাকে।
এই কারণে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রায় ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এ বিষয়ে কার্যকর কোন অগ্রগতি না হওয়ায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ মিটিং এর আয়োজন করে। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এর মিটিং শেষে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম. সারাভানান অতি সত্বর বাংলাদেশী কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে ২৫টি বিআরএ’র মাধ্যমে কর্মী গমণ শুরু করা এবং সার্বিক দিক বিচার বিবেচনা করে পরবর্তী ধাপে এজেন্সির সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে তিনি সম্মত হন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সরকারি খাতের BOESL সহ এই সংখ্যা ১০১ এ উন্নীত হয়। এই সাথে সহযোগী এজেন্সি এবং Supply Chain এর অর্ন্তভূক্ত প্রায় ১৩ শত রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হয়।
অত:পর ২০২২ সালে ২রা জুন তারিখের পর জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ মিটিংয়ের আলোকে মালয়েশিয়ার নিয়োগকারীগণ কর্মী নিয়োগের সরকারী অনুমোদন গ্রহণ পূর্বক মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনে ডিম্যান্ড লেটার জমা করলেও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে হাই কমিশন এ সকল ডিম্যান্ড লেটার দীর্ঘ দিন সত্যায়নে বিলম্ব হয়। এতে অনেক নিয়োগকারী হতাশ ও অসন্তুষ্ট হয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশ নেপাল হতে কর্মী নিয়োগ শুরু করে দেয়।
পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন ও BMET-তে মালয়েশিয়া সরকারের সিস্টেম ইন্টিগ্রেট করে এবং অনলাইন সিস্টেমে ডিম্যান্ড লেটার সত্যায়ন শুরু করার পর ২০২২ সালের আগষ্ট মাস হতে মালয়েশিয়ায় কর্মী গমন শুরু হয়। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাগণও বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগী হন। ফলশ্রুতিতে অ্যালোকেশন প্রাপ্ত কোটার মধ্যে ইতঃমধ্যে ৪,৭২,৪৭৬ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গমন করেছেন।
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের অধীনে ভিসা ক্রয়-বিক্রয় নিরুৎসাহিত করার লক্ষে মালয়েশিয়া সরকার প্যানেলভূক্ত বিআরএ সমূহের জন্য Online based Auto Allocation সিস্টেমে প্যানেলভূক্ত বিআরএ সমূহের মধ্যে কোটা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে। উল্লেখ্য যে, মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক অনুমোদিত প্যানেলভূক্ত বিআরএ’র বাইরের অনেক এজেন্সি এবং এক শ্রেনীর প্রবাসী ও মধ্যস্বত্বভোগী ভিসা ক্রয়-বিক্রয়ে লিপ্ত হয়। তারা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষমতাপত্র (Authorization Letter) নিয়ে অ্যালোকেশন প্রাপ্ত বিআরএ’র মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা করে। এই প্রক্রিয়ায় প্যানেলভূক্ত বিআরএ’র বাইরে প্রায় ১৩ শত রিক্রুটিং এজেন্সি মার্কেটিং এবং সাপ্লাই চেইন (কর্মী নির্বাচন ব্যবস্থা) নিয়ন্ত্রণের কারণে অভিবাসন ব্যয় বহুকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণে দু-দেশের সরকারের স্বদিচ্ছা ও সক্রিয় কার্যক্রমের ফলশ্রুতিতে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সীগণ প্রায় পৌঁনে পাঁচ লক্ষ কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহ এই বিপুল সংখ্যক যুবকদের বেকার সমস্যা-সমাধান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে।
মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশী কর্মীদের মূল বেতন সর্বনিম্ন ১৫০০ রিঙ্গিত এবং ওভারটাইমসহ তাদের বেতন প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো যা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন। এছাড়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার কারণে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে বাংলাদেশীদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায়। মালয়েশিয়া সরকার ইত:মধ্যে ভিজিট ভিসায় গিয়ে সেদেশে অবৈধভাবে কাজ করার পন্থা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়। এতে বৈধ পন্থায় গমনকারী কর্মীদের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। প্রকৃতপক্ষে, কর্মী ভিসায় বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিকগণের কল্যাণ নিশ্চিতকরণে মালয়েশিয়া সরকার আন্তরিক।
ইত:মধ্যে Employers Pay Model (Zero Cost Migration নামে সমধিক পরিচিত)-এর আওতায় সরকারি খাতের BOESL এবং বেসরকারি খাতের কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি ২,০০০ এর অধিক কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কর্মীদের কোন প্রকার অর্থ ব্যয় না হলেও নিয়োগকারীগণ টিকেট, ভিসা, মেডিকেল, ইনস্যুরেন্স, বিএমইটি ছাড়পত্র এবং মালয়েশিয়ায় প্রদত্ত লেভিসহ সকল ব্যয় বহন করে থাকে।
মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সহ ১৪টি সোর্স কান্ট্রির সকল কোটা প্রাপ্ত কর্মীদেরকে ৩১ মে, ২০২৪ তারিখের মধ্যে সেদেশে প্রবেশের সময় সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বায়রা’র নেতৃবৃন্দের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কিছু অতিরিক্ত / চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সহ ১৪টি সোর্স কান্ট্রি হতে কর্মী নিয়োগ সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত করেছে। পরবর্তীতে সেক্টর ভিত্তিক চাহিদা যাচাইয়ের পর নতুন করে কর্মী নিয়োগ করবে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মালয়েশিয়া সরকারের ইকোনোমিক প্লানিং ইউনিট এর টার্গেট মোতাবেক সেদেশে বিদেশী কর্মীর সর্বোচ্চ সিলিং ২.৫০ মিলিয়ন। মালয়েশিয়ার পরিসংখ্যান মোতাবেক ৩১ মে, ২০২৪ তারিখের মধ্যে সেদেশে পুরনো এবং নতুনভাবে গমনকারী কর্মীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ২.৬০ মিলিয়ন। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মীর সংখ্যা টার্গেটের চেয়ে বেশি হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি এবং প্লান্টেশন খাতে বড় ধরণের ঘাটতি রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষিতে আশা করা যায় যে, মালয়েশিয়া সরকার নতুন নিয়ম-নীতি নির্ধারণ পূর্বক পুনরায় এসকল খাতে কর্মী নিয়োগ শুরু করবে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মালয়েশিয়া সহ সকল দেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদেশগামী কর্মীদের আত্মীয়-স্বজন এবং Host Country-তে বসবাসরত প্রবাসী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ স্থানীয়ভাবে ভিসা ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই অনেকটা অস্বচ্ছ রয়ে গেছে। অন্যদিকে কর্মীরা সরাসরি তালিকাভূক্ত এজেন্সির কাছে না এসে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, অননুমোদিত এজেন্সি এবং বিভিন্ন মধ্যস্বত্বাভোগীদের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করে মূল এজেন্সির কাছে আসায় অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয়ের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন না হওয়া এবং সিস্টেমটি ডিজিটালাইজ্ড না থাকায় এই খাতের অর্থ লেনদেনের বিষয়টি এখনো কোন নির্ভরযোগ্য সিস্টেমের উপর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি ২০২২ সালের আগষ্ট মাসে বাংলাদেশীদের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং ২০২৪ সালের ৩১ মে’ পর্যন্ত ২২ মাসে প্রায় পৌনে ৫ লক্ষ কর্মীর কমর্সংস্থান হয়। মালয়েশিয়ায় কর্মীদের বর্তমানে বেতন-ভাতা উপসাগরীয় দেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় (ন্যূনতম ১৫০০ রিঙ্গিত যা’ ৪০,০০০/- টাকার সমপরিমাণ) কর্মীগণ যোগদানের ৬ মাসের মধ্যেই তাদের অভিবাসন বাবদ ব্যয়িত অর্থ উপার্জনে সক্ষম হন। পরবর্তীতে গড়ে ০৫-১০ বছর উপার্জিত অর্থ দেশে প্রেরণ করে নিজেরা লাভবান হন এবং দেশের অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক বিগত ২০২১-২২, ২২-২৩, ২৩-২৪ অর্থবছরে মালয়েশিয়া হতে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির পরিমাণ যথাক্রমে ১০২১.৮৫, ১১২৫.৯০ এবং ১৭৪৪.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ২০২১-২২ এর তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার প্রায় ৭১ শতাংশ।
২০২২ সালের আগষ্ট মাস হতে মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী গমনের ফলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই সুফল পাওয়া গেছে এবং সমগ্র বিশ্বে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দিক দিয়ে মালয়েশিয়া ৮ম স্থান থেকে বর্তমানে ৫ম স্থানে উন্নীত হয়েছে। ২০১২ সাল হতে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের সংখ্যা এবং ২০১১-১২ অর্থবছর হতে তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বর্তমান ধাপে সোর্স কান্ট্রিসমূহ হতে মালয়েশিয়ায় গমনকারী সর্বমোট ১১,০৫,২১৫ জন কর্মীর মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশ হতে গমন করেছে ৪,৭২,৪৭৬ জন কর্মী এবং শতকরা হারে বাংলাদেশের শেয়ার ৪২.৭০% এবং অন্যান্য সকল দেশের শেয়ার সম্মিলিতভাবে ৫৭.৩০%। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চার্ট আকারে নিম্নে প্রদত্ত হলো।
নিয়োগকারী দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশক্রমে মন্ত্রণালয় নিয়োগানুমতি এবং বিএমইটি ছাড়পত্র দেয়, যার ভিত্তিতে রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহ কর্মীদেরকে সেদেশের সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করে থাকে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা না করে অধিক কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দিলে সেক্ষেত্রে কর্মীরা বিড়ম্বনার স্বীকার হন। এ সমস্যাটি হতে পরিত্রাণ পেতে দু’দেশের সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন বিষয়টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কর্মী নিয়োগের অনুমোদন যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদেরকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে প্রেরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশসমূহে তাদের অনুমোদিত সীমিত সংখ্যক এজেন্সি কর্মী প্রেরণ করতে পারে। এতদসত্বেও, সকল দেশকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ, তদন্ত ও একতরফা নজরদারীর মাধ্যমে এখাতে সংশ্লিষ্ট সকলের উপর বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে সংস্কারের নীতি বাস্তবায়নকারী বৈষম্যবিরোধী বর্তমান সরকারের জন্য সকল দেশের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন সার্বজনিন নীতি অবলম্বন করা যুক্তিসংঙ্গত হবে। এতে সমতার নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনশক্তি রপ্তানি খাতে নিয়োজিত বায়রা’র সদস্যবৃন্দ অধিকতর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশের বেকার সমস্যার সমাধান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।