মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির প্রেক্ষাপট
প্রকাশিতঃ ১৭ অক্টোবর, ২০২৪ | English Version
প্রকাশিতঃ ১৭ অক্টোবর, ২০২৪ | English Version
১৯৭৮ সালে ২৩ জন কর্মী প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারের সূচনা হলেও ২০০৯ সাল থেকে এই বাজারে অনিয়ম, যেমন ভিসা জালিয়াতি, পাসপোর্ট জালিয়াতি, এবং অবৈধ উপায়ে প্রবেশের ফলে বারবার তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১২ সালে G2G চুক্তি এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে G2G Plus পদ্ধতির মাধ্যমে সীমিত এজেন্সির ব্যবস্থাপনায় বাজারটি পুনরায় চালু করা হয়। এই পদ্ধতিতে FWCMS (Foreign Workers Centralized Management System) নামক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানো হয়। ২০২১ সালে মালয়েশিয়ার সাথে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে, তালিকাভুক্ত ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ সহজ হয়। তবে অবৈধ এজেন্সি এবং সহযোগী এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা ক্রয়-বিক্রয়, মধ্যসত্বভোগী যুক্ত হওয়ায় অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায়। সুপারিশ হিসেবে অভিবাসন প্রক্রিয়ার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এজেন্সি ব্যবস্থার মধ্যেই প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
২৩ জন বাংলাদেশী কর্মী গমনের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শুরু হলেও দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯২ সালে। আনুষ্ঠানিক চুক্তির কিছুদিন পরেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৯৬ সালে উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বহুবার শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত ও বন্ধ হয় এবং ২০০৯ সাল হতে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি মূলত: দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশী কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম যথা; পাসপোর্ট জালিয়াতি, গলাকাটা পাসপোর্ট, ভুল তথ্য সম্বলিত পাসপোর্ট নিয়ে অপরাধীদের মালয়েশিয়ায় গমন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অভিবাসনের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি-বিচ্যুতি, নিয়োগকর্তা হতে বাংলাদেশী কর্মীদের পলায়ন, অসাধু এজেন্ট ও দালালের মাধ্যমে ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে কাজে নিযুক্ত হওয়া প্রভৃতি কারণে মালয়েশিয়া সরকার ও নিয়োগকর্তাগণ বাংলাদেশী কর্মীদের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এতে ২০০৯ সাল হতে ২০১২ সাল পর্যন্ত স্বল্প কিছু সংখ্যক প্রফেশনাল ক্যাটাগরির কর্মী মালয়েশিয়া গমন করলেও সাধারণ কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ থাকে।
অতঃপর দু’দেশের সরকারের মধ্যে ২০১২ সালে G2G চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলেও ২০১৫ সাল নাগাদ ০৯ (নয়) হাজারের মতো কর্মী মালয়েশিয়া গমন করে। যদিও মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশীদের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০(ত্রিশ) হাজার কোটার অনুমতি দেয়। এই পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগে নিয়োগকর্তাগণ আগ্রহী না হওয়ায় মূলত: জি টু জি পদ্ধতি সফল হয়নি।
সরকারিভাবে কর্মী গমন উল্লেখযোগ্য না হলেও অবৈধভাবে সমুদ্রপথে এবং থাইল্যান্ড সীমানা দিয়ে বহু সংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী মালয়েশিয়া গমনের চেষ্টা করে। এর ফলে অনেক কর্মী সমুদ্র পথে দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। অনেকে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরে সেদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ধরা পড়ে এবং কিছু সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সেদেশে কর্মে নিযুক্ত হয়। তবে অবৈধ পথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় গমনের ক্ষেত্রে অনেকে দু'দেশের সীমান্তে মৃত্যুবরণ করেন এবং ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের সীমান্ত অঞ্চলে এ সকল বাংলাদেশীদের গণকবর আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে দেশের সুনাম নষ্ট হয়, মৃত্যুবরণকারী কর্মীদের পরিবার-পরিজন যার-পর-নাই দূর্দশাগ্রস্ত হয় এবং সরকার বিব্রত হয়।
এসকল বিষয় সত্বেও বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে, ইত:পূর্বে বর্ণিত অনিয়ম ও জাল-জলিয়াতির কারণে সরকারীভাবে G2G পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির বাইরে সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণে অনীহা প্রকাশ করে।
এই প্রেক্ষিতে দু'দেশের সরকারের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ২০১৬ সালে ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে G2G পদ্ধতির পাশাপাশি সীমিত সংখ্যক বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। উক্ত সমঝোতা স্মারকে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ হতে কর্মী নিয়োগে একমত` হয়। এই সমঝোতা স্মারকটি G2G Plus নামে অবহিত। এই চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মালয়েশিয়া সরকার এই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করে যে, সরকারি এবং সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ করলে উপরেবর্নিত অনিয়ম, জালিয়াতি অনেকটা বন্ধ হবে এবং এ পদ্ধতির ক্ষেত্রে যদি কোন অনিয়ম হয়, তাহলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সহজে চিহ্নিত করে দায়-দায়িত্ব নিরূপণের পর তাদেরকে জবাবদীহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সাথে মালয়েশিয়া সরকারের অনলাইন বেইজড কেন্দ্রিক ডিজিটাল প্লাটফর্ম এর আওতায় কর্মী নিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতি চালু করে যা’ FWCMS (Foreign Workers Centralized Management System) নামে অভিহিত। এতে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনিয়ম অনেকাংশই দূর হয়েছে।
FWCMS সিস্টেমটি মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট, মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং আমাদের দেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তালিকাভুক্ত মেডিকেল সেন্টারসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও এজেন্সির সাথে ইন্টিগ্রেট করা হয়। এতে প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্বচ্ছ এবং ডকুমেন্ট জাল-জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব হয়। কর্মীগণ যথারীতি কাজে নিয়োজিত হয় এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা পায়। তবে এই পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত না হতে পারা এজেন্সিসমূহ বিভিন্ন প্রকার অভিযোগ উত্থাপন করে এবং একইভাবে প্রতিবেশী দেশসমূহ হতেও বিভিন্ন প্রকার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ফলশ্রুতিতে মালয়েশিয়া সরকারের তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মাহাথির মোহাম্মদ অভিবাসন প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশনা দেন।
অতঃপর মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অভিযোগসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই এর পর মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানবসম্পদ মন্ত্রী এম. কুলাসেগারান ২০১৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার জাতীয় সংসদকে জানান যে, কথিত অভিযোগের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সাথে মানবসম্পদ মন্ত্রী পুনরায় বাংলাদেশ হতে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এই পটভূমিকায় বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার সাথে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০২১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর সেদেশে কর্মী প্রেরণের নিমিত্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। উক্ত সমঝোতা স্মারকে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ পূর্বক কর্মী প্রেরণের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার এই মর্মে সম্মতি হয় যে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরবরাহকৃত বৈধ লাইসেন্স এর মধ্য হতে মালয়েশিয়া সরকার অনলাইন ভিত্তিক অটোমেশন সিস্টেম-এ নির্দিষ্ট সংখ্যক এজেন্সি নির্বাচন করবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দীর্ঘ ০৬ মাস পর ২০২২ সালের জুন মাসে দুই দেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ মিটিং-এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী গমন শুরু হয়। অতঃপর মালয়েশিয়া সরকার এই সংখ্যা BOESL সহ ১০১ টিতে উন্নীত করে এবং ২০২২ সালের ৮ই আগস্ট হতে ৩১ মে, ২০২৪ পর্যন্ত মোট ৪,৭৬,৬৭২ জন কর্মী প্রেরণ সম্ভব হয়।
অনলাইন বেইজড কেন্দ্রীক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগের আবেদন, ডিম্যান্ড লেটার সত্যয়ন, মন্ত্রণালয়ের নিয়োগানুমতি, কর্মী নির্বাচন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাক বহির্গমন, অরিয়েন্টেশন ও ট্রেনিং সম্পন্নের পর চূড়ান্তভাবে বিএমইটি’র বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণ পূর্বক কর্মীগণ মালয়েশিয়ায় গমণ করায় ডকুমেন্ট জাল-জালিয়াতি পরিহার করে কর্মীগণ সুশৃংখলভাবে নিয়োগ কর্তার কাজে যোগদান করতে সক্ষম হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মালয়েশিয়া সরকার অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক অনেক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করে। যেহেতু সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ হতে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ছয়টি ট্রেনিং সেন্টার ও ১৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ হতে কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে থাকে এবং এতে অভিবাসন প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। সেজন্য মালয়েশিয়া সরকার ইত:মধ্যে উল্লেখিত অনিয়মসমূহ দূরীকরণে সীমিত সংখ্যক এজেন্সির বাইরে অসংখ্য এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
তবে মালয়েশিয়া সরকারের সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তালিকা বহির্ভূত রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহ মানববন্ধন, মিটিং-মিছিল ও ঘেরাও এর মতো কর্মসূচি দিয়ে অভিবাসন প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত করায় মন্ত্রণালয় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহকে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করার বিষয়ে অনাপত্তি জ্ঞাপন করে। এর ফলে তালিকা বহির্ভূত সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহ ভিসা ক্রয়-বিক্রয়সহ নিয়োগকর্তার স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কর্মী নির্বাচন ও সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রনের সুযোগ লাভ করে। ফলশ্রুতিতে অভিবাসন ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য কাঙ্খিত শ্রমবাজারটির সুযোগ গ্রহণের লক্ষে মালয়েশিয়া সরকার অনুসৃত নীতির বিরোধীতা না করে সেদেশের সরকার অনুমোদিত অভিবাসন পদ্ধতি বা এজেন্সির সংখ্যা প্রসঙ্গে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরী।
একইসাথে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষে দু’দেশের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির বাইরের মধ্যসত্বভোগী ও সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা বিলুপ্ত করে সরাসরি সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ পূর্বক কোটাপ্রাপ্ত এজেন্সিসমূহের পক্ষে অভিবাসন প্রক্রিয়ার সকল কাজ সরাসরি সম্পন্ন করা সম্ভব হলে নিরাপদ অভিবাসনের সাথে সাথে অভিবাসন ব্যয়ও কাঙ্খিত মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।