বাংলাদেশী কর্মীদের মালয়েশিয়া অভিবাসনের ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকের তথ্য
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৪ | English Version
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৪ | English Version
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ভুল তথ্য প্রচার ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ শ্রমবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হচ্ছে, যা মালয়েশিয়ার Auto Allocation System-এর মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে। তালিকাভুক্ত ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী সফলভাবে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। তবে মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত ২.৫ মিলিয়ন বৈদেশিক কর্মী কোটার সীমা পূর্ণ হওয়ায় বর্তমানে ১৫টি সোর্স কান্ট্রির কর্মী নিয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য অভিযোগের ভিত্তিতে মিডিয়ায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কর্মী অভিবাসন প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি নির্বাচন, ভিসা ক্রয়-বিক্রয়, তালিকাভুক্ত এজেন্সি কর্তৃক অধিক অভিবাসন ফি আদায়, শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের জন্য মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ প্রভৃতি বিষয়ে মিডিয়ায় ভুল তথ্য প্রচার-প্রচারণার কারণে তালিকাভূক্ত এজেন্সিসমূহ, মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং নিয়োগকারীগণ সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় অভিবাসন প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ সকল বিষয়ে প্রকৃত তথ্য নিম্নরূপ:
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের লক্ষে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এবং উপরিউক্ত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০২২ সালের ০২ জুন তারিখে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মালয়েশিয়ায় মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ মিটিং-এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক কর্মী গমন শুরু করার নিমিত্ত এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মালয়েশিয়া সরকার সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী গ্রহণ করবে এবং মালয়েশিয়া সরকার এজেন্সি নির্বাচনে দায়িত্ব নিবে। এই প্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রেরিত ১৫২০টি বৈধ লাইসেন্সের মধ্য হতে মালয়েশিয়া সরকার প্রাথমিকভাবে ২৫টি লাইসেন্স এবং পরবর্তীতে সরকারি খাতের BOESL সহ মোট ১০১টি লাইসেন্স তালিকাভূক্ত করে। তালিকাভূক্ত এজেন্সিসমূহ ৮ই আগষ্ট ২০২২ হতে ৩১ মে, ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত ৪,৭৬,৬৭২ জন কর্মীকে সফলভাবে মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করেছে।
মালয়েশিয়া সরকারের নির্ধারিত Foreign Workers Centralized Management System (FWCMS)এর মাধ্যমে Auto Allocation System-এ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের কোটা বরাদ্দ হয়। উক্ত বরাদ্দকৃত কোটার অনুকূলে বাংলাদেশ হাই কমিশন কর্তৃক ডিম্যান্ড লেটার সত্যায়ন এবং মন্ত্রণালয়ের নিয়োগানুমতির পর কর্মীদের মেডিকেল, কলিং ভিসা ও ই-ভিসা সংগ্রহ করা হয় এবং পরবর্তীতে বিএমইটি’র বহির্গমন ছাড়পত্র প্রাপ্তির পর কর্মীদেরকে মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করা হয়। তালিকাভূক্ত ১০১টি এজেন্সি মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক Auto Allocation System-এ কোটা বরাদ্দ পেয়েছে বিধায় মালয়েশিয়ার নিয়োগকারীর নিকট থেকে ভিসা ক্রয়ের প্রয়োজন হয়নি।
তালিকাভূক্ত এজেন্সি দু’দেশের নিয়ম-কানুন এবং নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ করেছে। তালিকাভূক্ত এজেন্সিসমূহ কর্তৃক প্রেরিত সকল কর্মীগণ যথা নিয়মে নিয়োগকারীদের কর্মে যোগদান করেছেন এবং তারা সকলে ভালো আছেন। এসকল কর্মীগণ ন্যূনতম ১৫০০ রিঙ্গিত মূল বেতন এবং ওভারটাইমসহ মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তালিকাভূক্ত এজেন্সি সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় গ্রহণ করেছে, অতিরিক্ত কোন অর্থ গ্রহণ করেনি। প্রত্যেক কর্মীকে গৃহীত অর্থের রিসিট প্রদান করা হয়েছে।
তালিকাভূক্ত এজেন্সি ভিসা ক্রয়-বিক্রয়ে বা অন্য কোন কারণে কোন এজেন্সির কাছ থেকে কোন অর্থ গ্রহণ করেনি বা মালয়েশিয়ায় কোন অর্থ প্রেরণ করেনি। প্রত্যেক তালিকাভূক্ত এজেন্সি তার নিজ নিজ এজেন্সির অনুকূলে বরাদ্দপ্রাপ্ত কোটার কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় অভিবাসন ফি গ্রহণ পূর্বক তাদেরকে মালয়েশিয়ায় প্রেরণের ব্যবস্থা করেছে।
মালয়েশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইকোনোমিক প্ল্যানিং ইউনিট এর অনুমোদন মোতাবেক সেদেশে বিদেশী কর্মীদের সর্বোচ্চ সিলিং ২.৫ মিলিয়ন। সরকারের পরিসংখ্যান মোতাবেক ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক কর্মী নিয়োগের জন্য প্রদত্ত কোটা এই সীমা অতিক্রম করায় মালয়েশিয়া সরকার সকল সোর্স কান্ট্রির জন্য নতুন কোটার আবেদন বন্ধ করে। এ সংক্রান্ত ০১ মার্চ ২০২৪ তারিখে ইস্যুকৃত মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট-এর এক সার্কুলারে সরকার এই মর্মে ঘোষণা করে যে, ইস্যুকৃত সকল কোটার কর্মীদেরকে ৩১ মে, ২০২৪ তারিখের মধ্যে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে সকল ১৫টি সোর্স কান্ট্রির কর্মীদের জন্য ০১ জুন ২০২৪ তারিখ হতে মালয়েশিয়ায় কর্মী গমন বন্ধ আছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ বিষয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন সংবাদ প্রচারের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো সেরি সাইফুদ্দিন নাসুসন ইসমাইল ২১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে এক ঘোষণায় বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান যে, মালয়েশিয়ার ইকোনমিক প্ল্যানিং ইউনিট অনুমোদিত ২.৫ মিলিয়ন বৈদেশিক কর্মীর কোটা প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এমতাবস্থায়, বৈদেশিক কর্মী নিয়োগের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাটি পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে ।
(Source: NST)
সুতরাং, শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, সকল ১৫টি সোর্স কান্ট্রির জন্যই মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক কর্মী নিয়োগ বন্ধ আছে।
তালিকাভূক্ত এজেন্সি বা এর স্বত্বাধিকারীগণ মালয়েশিয়া হতে ভিসা ক্রয়-বিক্রয় বা সেদেশে অর্থ প্রেরণের সাথে জড়িত নন। ইত:পূর্বে বিগত ২০১৭-১৮ সালে এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে ঐ সময়ে তালিকাভূক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে তদন্তকাজের পরিসমাপ্তির ঘোষণা করে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় গমণকারী কর্মীগণের অবদানে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দিক দিয়ে মালয়েশিয়া ৮ম স্থান হতে ৪র্থ স্থানে উন্নীত হয়েছে এবং শুধুমাত্র আগষ্ট, ২০২৪ সালে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২৫১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের ন্যয় মালয়েশিয়া সরকার ও নির্দিষ্ট সংখ্যক ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেয়। দু’দেশের সরকার ভিসা ক্রয়-বিক্রয় বন্ধের লক্ষে Auto Allocation System প্রচলন করে যাতে উচ্চ মূল্যে ভিসা ক্রয়ের পথ বন্ধ হয়। সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করে ২০২২ সালের ৮ই আগষ্ট হতে ৩১ মে, ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত ৪,৭৬,৬৭২ জন কর্মীর মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান হয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার Malaysian Employment Facilitation Centre (MEFC)-এর মাধ্যমে শুধুমাত্র কর্মী ভিসা প্রসেসিং এর অনুমোদন দেয়। অন্যান্য অনুমোদিত ভিসা সেন্টারকে কর্মী ভিসা ব্যতিত ভিসিট / ট্যুরিস্ট প্রভৃতি ভিসা প্রসেস করার অনুমোদন দেয়। তবে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস হতে MEFC স্থলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কোম্পানিতে ভিসা প্রসেসিং এর দায়িত্ব দেয়। MEFC ঢাকা থেকে FWCMS-এর Technical কাজে সহায়তা করেছে।
এ প্রসেঙ্গ উল্লেখ্য যে, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল এর তত্ত্বাবধানে কয়েকটি তালিকাভূক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা খরচে (Employers Pay Model / Zero Cost Migration) ৩৫৮ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিয়োগকারী কোম্পানি সকল অভিবাসন ব্যয় বহন করেছে এবং এসকল এজেন্সিকে ব্যাংকিং চ্যানেলে মালয়েশিয়া হতে রিক্রুটিং চার্জ পরিশোধ করেছে। এই সাথে BOESL-ও প্রায় দুই হাজার কর্মীকে স্বল্প/বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করেছে।
প্রকৃত:পক্ষে ১০১টি বিআরএ মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক তালিকাভূক্ত হলেও সহযোগী এবং নিয়োগকর্তার অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে আরো ৮০০টির অধিক এজেন্সি বর্তমান ধাপে (২০২২-২৪) মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। তবে ব্যবসায়িক প্রতিযোগীতা এবং বায়রা’র ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজ নিজ গ্রুপ বা প্যানেলের স্বার্থ হাসিলের জন্য বায়রা’র সদস্যবৃন্দ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, এমনিক বায়রা’র নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভায় হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং বায়রা অফিসে ভাংচুর হয়েছে। জনশক্তি রপ্তানির খাত এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের স্বার্থে প্রকৃত তথ্য মিডিয়ায় প্রচার হওয়া প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে কোন ভুল তথ্য বা রিপোর্ট পুরো শ্রমবাজারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।