প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সমন্বয়হীনতা
প্রকাশিতঃ ২৪ নভেম্বর, ২০২৪ | English Version
প্রকাশিতঃ ২৪ নভেম্বর, ২০২৪ | English Version
সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি (MoU) মোতাবেক ২০২২ সালে ৮ ই আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে’ পর্যন্ত ৪ লক্ষ ৭২ হাজার ৪৭৬ জন মালয়েশিয়ায় গমন করেন। চাহিদা অনুযায়ী কর্মীর কোটা পুরণ হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার ০১ মার্চ ২০২৪ তারিখের পূর্ব ঘোষিত সার্কুলার মারফত বাংলাদেশসহ কর্মী প্রেরণকারী ১৫টি সোর্স কান্ট্রি সমূহকে জানায় যে, তারা ৩১ মে, ২০২৪ তারিখের পরে সাময়িকভাবে কর্মী গ্রহণ বন্ধ রাখবে। ইস্যুকৃত ডিম্যান্ড লেটারের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ায় কাজে যোগদানকারী কর্মীদের সেক্টর ভিত্তিক পরিসংখ্যান নিয়ে পরবর্তীতে খাত ভিত্তিক নুতন চাহিদা নিরূপণের পর কর্মী নিয়োগের লক্ষে মালয়েশিয়া সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলে জানা যায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হতে এ বিষয়টি সম্পর্কে প্রথমত: তেমন কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রতিবেশী সকল দেশ মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সোর্স কান্ট্রি হওয়ায় এবং হজ্জ মৌসুমের কারণে টিকিটের তীব্র সংকট এবং একপর্যায়ে টিকিট না পাওয়ায় ভিসা প্রাপ্ত বেশ কিছু সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় গমনে অপারগ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বায়রা’র সক্রিয় উদ্যোগে কয়েকটি চার্টার্ড ফ্লাইটসহ সকল নিয়মিত ফ্লাইটের মাধ্যমে শুধুমাত্র ২০২৪ সালের মে, মাসেই ৪৫,০৩১ জন কর্মী গমন করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে অন্য সকল ১৪টি সোর্স কান্ট্রি হতে মে’ মাসে ৪৪,০৭৫ জন কর্মী গমন করে। উল্লেখ্য যে, নিয়োগকর্তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ মে’ মাসের শেষ পর্যন্ত e-Visa ইস্যু করতে থাকে এবং বিএমইটিও e-Visa প্রাপ্ত কর্মীদের জন্য মে’ মাসের শেষ পর্যন্ত ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র দেওয়া অব্যাহত রাখে। এতে করে মে’ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে বিএমইটি’র ছাড়পত্র প্রাপ্ত কর্মীগণ শেষ মুহূর্তে আর মালয়েশিয়ায় গমন করতে পারেননি। স্মর্তব্য যে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে e-Visa প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্ব ঢাকাস্থ MEFC’র পরিবর্তে নিয়োগকর্তাদের কাছে চলে যাওয়ায় অনুমোদিত এজেন্সি সমূহের পক্ষে প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করার সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে সঠিক তালিকা ছাড়া ভিসা ও বিএমইটি ছাড়পত্র প্রাপ্ত কর্মীদের মধ্যে যারা মালয়েশিয়ায় গমন করতে পারেননি তাদের সংখ্যা ১৭,০০০ বলে মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে।
অত:পর ০১ জুন ২০২৪ তারিখে মালয়েশিয়ায় কর্মী গমন বন্ধ হওয়ার পর ভিসা ও বিএমইট’র ছাড়পত্র প্রাপ্ত কর্মীদেরকে মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের অনুরোধ জানানো হয়। এই প্রেক্ষিতে ০৪ হাজারের মতো কর্মী মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি-তে রিপোর্ট করেন্, তবে মন্ত্রণালয় ঘোষিত ভিসা ও বিএমইট’র ছাড়পত্র প্রাপ্ত ১৭,০০০ কর্মী মালয়েশিয়ায় গমনে ব্যর্থ কর্মীদের তালিকা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে কোটার বরাদ্দ প্রাপ্ত এজেন্সি সমূহ, যাদের নামে বিএমইটি ছাড়পত্র ইস্যু করা হয়েছে তাদেরকে কর্মীদের সমস্ত অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল মহোদয় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিষয়টি আশু সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং ২৮ আগষ্ট, ২০২৪ তারিখে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সভা আহবান করেন, উক্ত সভায় সকল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে নিম্ন বর্ণিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকারী ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি কর্মী বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহের দায়-দেনা পরিশোধপূর্বক ০৩-০৯-২০২৪ তারিখের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে;
সংশ্লিস্ট সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহ মালয়েশিয়া যেতে না পারা কর্মীদের দায়-দেনা পরিশোধপূর্বক প্রমাণকসহ ১০-০৯-২০২৪ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অবহিত করবে;
সকল সংশ্লিষ্ট রিক্রেটিং এজেন্সি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালায় এবং নির্ধারিত তারিখের মধ্যে তালিকাভুক্ত এজেন্সি সমূহ সরাসরি এবং সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে অধিকাংশ কর্মীদের পাসপোর্ট ও অর্থ ফেরত প্রদান করে। তবে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহ তাদের কর্মীদেরকে অর্থ ফেরত দানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। অতঃপর ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয় এক মতবিনিময় সভায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এই মর্মে অবহিত করেন যে, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরনকারী ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সীর অধিকাংশই কর্মীদেরকে সরাসরি বা সহযোগী এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীদের অর্থ ফেরত দানের ব্যবস্থা করেছেন। তবে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি সমূহ ২৫ শতাংশের মতো কর্মীদের অর্থ ফেরত প্রদান করেছেন। মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয় ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিশেষত: সহযোগী এজেন্সি সমূহকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কর্মীদের অর্থ ফেরত দানের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, তালিকা বহির্ভূত (মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদনহীন) রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়োগকারীর নিকট হইতে ভিসা ক্রয় করে Dummy Demand Letter এবং Power of Attorney নিয়ে কর্মী সরবরাহ ও নির্বাচনের অধিকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, ফলে তালিকাভুক্ত এজেন্সি সমূহ নিয়োগকারীর ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিনিধির নিকট হতে কর্মী গ্রহণ করতে বাধ্য হয় এবং তালিকাভুক্ত এজেন্সি হিসাবে শুধুমাত্র প্রসেসিং এজেন্টের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়। কর্মী নির্বাচনে সরাসরি তালিকাভুক্ত এজেন্সি সম্পৃক্ত না থাকায় মালয়েশিয়ায় অভিবাসনের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই অনুমোদনহীন এজেন্সির কাছে চলে যায়। এই সুযোগে তারা অভিবাসন ব্যয় ইচ্ছা অনুযায়ী সীমাহীনভাবে বৃদ্ধি করে এবং এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ৫ লক্ষ টাকা বা ততোধিক টাকা আদায় করে থাকে। অনুমোদনহীন এ সকল এজেন্সি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চড়া দামে (বে-আইনিভাবে) ভিসা ক্রয় করে এবং কর্মীর নিকট হতে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে অবৈধ পন্থায় নিয়োগকর্তাকে পরিশোধ করে অথচ পুরো বিষয়টির দায়-দায়িত্ব অনুমোদিত ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির উপর চাপানোর চেষ্টা করেছে।
স্মর্তব্য যে, বর্তমান সচিব মহোদয় এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর ০২ মাস যাবত মন্ত্রণালয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেননি। ফলে ২০২৩ সালের সত্যায়িত ডিম্যান্ড লেটারের অনুকূলে ২০২৪-এর মার্চ মাসে নিয়োগানুমতি পেয়ে কর্মী বাছাই, কলিং ভিসা এবং e-Visa পাওয়ার পর মে মাসের আগে এসকল কর্মীর বিএমইটি ছাড়পত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অত:পর মে’ মাসে টিকেটের তীব্র সংকটের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ৪৫,০৩১ বাংলাদেশী কর্মীকে প্রেরণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে অন্য সকল ১৪টি সোর্স কান্ট্রি হতে মে’ মাসে গমন করে ৪৪,০৭৫ জন কর্মী।
মাননীয় উপদেষ্টা অধ্যাপক ডঃ আসিফ নজরুল মহোদয় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথেই সার্বিক বিষয়টি উপলব্ধি করে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং সিদ্ধান্তের আলোকে দূতাবাস সমূহের শ্রম উইং কর্তৃক সত্যায়িত ডিম্যান্ড লেটার পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের নিয়োগানুমতি গ্রহণের প্রথা বিলুপ্ত করে জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সময় (Lead Time) কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং মালয়েশিয়া যেতে না পারা কর্মীদের অর্থ ফেরত দানের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। জনশক্তি রপ্তানি খাতের এজেন্সি সমূহ মাননীয় উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল মহোদয়ের এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। তবে মিটিং-এর সিদ্ধান্ত এবং মাননীয় উপদেষ্টা ডঃ আসিফ নজরুল মহোদয়ের বাস্তবসম্মত নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিভিন্ন প্রকার জটিলতা দেখা দিয়েছে।